বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনী প্রচারণার ভাষা বদলে যাচ্ছে। পোস্টার, মাইক কিংবা জনসভার পাশাপাশি এবার ভোটের সমীকরণ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। লোকগানের সুরে তৈরি রাজনৈতিক গান থেকে শুরু করে ছোট ভিডিও, ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট ও আবেগঘন বার্তায় ভরে উঠেছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো।
সম্প্রতি জামায়াতের একটি রাজনৈতিক গান সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে অন্য প্রতীকগুলোর পরিবর্তে দাড়িপাল্লায় ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। এছাড়াও গানটিতে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার আহ্বান জানানো হয়। গানটি মূলত জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক মহলে তৈরি হলেও অল্প সময়েই ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে ভাইরাল হয়ে যায়। এতে দেশের দীর্ঘদিনের শাসক দলগুলোর প্রতীককে অতীতের অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরা হয় এবং জামায়াতের নির্বাচনী প্রতীক দাঁড়িপাল্লাকে সামনে আনা হয়।
নির্বাচন সামনে, অনলাইনে শুরু ‘যুদ্ধ’
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এবারের নির্বাচনে বিএনপি এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও মাঠপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হচ্ছে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে, তার অনেক আগেই অনলাইনে প্রচারণার লড়াই শুরু হয়ে গেছে।
বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলো ‘জেন-জি’ বা তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে কৌশল সাজাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এই তরুণরাই ক্ষমতার পালাবদলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গান, ভিডিও আর ভাইরাল কনটেন্ট
জামায়াতঘেঁষা গানের জনপ্রিয়তার পর বিএনপিও তাদের নিজস্ব প্রচারমূলক গান প্রকাশ করে। সেই গানে জনতা, দেশ ও নৈতিক রাজনীতির বার্তা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছাত্রদের গড়ে তোলা ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ও অনলাইনে আলাদা কনটেন্ট নিয়ে হাজির হয়েছে।
শুধু গান নয়—নাটকীয় শর্ট ভিডিও, ভোটারদের ব্যক্তিগত গল্প, দলীয় ইশতেহারের সহজ ব্যাখ্যা এবং প্রতিপক্ষকে ব্যঙ্গ করে তৈরি ভিডিওতে ভরে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
ডিজিটাল সংখ্যাই মূল শক্তি
রাজনৈতিক দলগুলোর অনলাইন প্রচারণায় এত জোর দেওয়ার পেছনে রয়েছে বিশাল ডিজিটাল উপস্থিতি। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার তিন-চতুর্থাংশের কাছাকাছি।
অন্যদিকে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান বলছে—বাংলাদেশে কোটি কোটি মানুষ নিয়মিত ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটক ব্যবহার করেন। নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে। অতীতের নির্বাচন নিয়ে হতাশ এই তরুণ ভোটাররা এবার ভোটাধিকার প্রয়োগে আগ্রহী বলে মনে করা হচ্ছে।
দলগুলোর ভিন্ন ভিন্ন কৌশল
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী রাজনীতিতে নিষেধাজ্ঞার কারণে এবারের নির্বাচন কার্যত দ্বিমুখী হয়ে উঠেছে।
বিএনপি নিজেদের অভিজ্ঞ ও স্থিতিশীল বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে। অনলাইনে তারা নীতিভিত্তিক ওয়েবসাইট চালু করেছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষক সহায়তা ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতিকে সামনে আনছে।
জামায়াত ভোটারদের সরাসরি সম্পৃক্ত করতে ‘জনতার ইশতেহার’ নামে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। তাদের অনলাইন প্রচারণায় জাতীয়তাবাদী আবেগ ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্যের ব্যবহার লক্ষ করা যাচ্ছে।
নির্বাচন ছাড়াও গণভোট
এবারের ভোট শুধু সংসদ নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ নয়। একই দিনে ‘জুলাই ন্যাশনাল চার্টার’ বা জুলাই সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই সংস্কার প্যাকেজের পক্ষে জনসমর্থন চেয়েছেন। এতে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে স্বৈরশাসন ঠেকানোর সাংবিধানিক প্রস্তাব রয়েছে।
সরকারও অনলাইনে এই সনদের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রচলিত গণমাধ্যমের প্রভাব কমে যাওয়ায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখন জনমত গঠনের প্রধান হাতিয়ার।
বিশ্লেষকদের মতে, মাঠের প্রচারণা এখনও গুরুত্বপূর্ণ হলেও তরুণ ভোটারপ্রধান বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অনলাইন প্রচারণাই শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয়ের ব্যবধান তৈরি করে দিতে পারে।
মন্তব্য করুন