নেটোর সঙ্গে আলোচনার পর গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সম্ভাব্য একটি চুক্তির বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র খতিয়ে দেখছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের বিরোধিতা করা ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি থেকেও সরে এসেছেন তিনি।
স্থানীয় সময় বুধবার (২২ জানুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, নেটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে তাঁর ‘খুবই ফলপ্রসূ বৈঠক’ হয়েছে। ওই বৈঠকের মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ড ও আর্কটিক অঞ্চল নিয়ে একটি সম্ভাব্য চুক্তির ‘কাঠামো’ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে চুক্তির বিস্তারিত বিষয়ে তিনি কিছু জানাননি।
নেটোও বৈঠকটিকে ‘খুবই ফলপ্রসূ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। জোটটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এর আগে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে দেওয়া বক্তব্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে না। তবে তিনি আলোচনার মাধ্যমে ওই অঞ্চলের মালিকানা–সংক্রান্ত সমাধানে আগ্রহী।
ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘গ্রিনল্যান্ডসহ পুরো আর্কটিক অঞ্চল নিয়ে ভবিষ্যৎ একটি চুক্তির কাঠামো আমরা তৈরি করেছি। এই সমাধান বাস্তবায়িত হলে তা যুক্তরাষ্ট্র ও নেটোর সব দেশের জন্যই ভালো হবে।’
তবে প্রস্তাবিত কাঠামোয় ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি মালিকানা থাকবে কি না—সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি তিনি। একটি মার্কিন কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ককে ট্রাম্প জানান, পরিকল্পনায় খনিজ সম্পদের অধিকারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
আলোচনা এগোলে আরও তথ্য প্রকাশ করা হবে বলেও জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ সরাসরি তাঁকে প্রতিবেদন দেবেন।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘দিনটি যেভাবে শুরু হয়েছিল, তার চেয়ে ভালোভাবেই শেষ হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান রেখেই কীভাবে আর্কটিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা–উদ্বেগের সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় চুক্তির সম্ভাব্য রূপরেখা নিয়ে আরও কিছু তথ্য সামনে আসে। সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, প্রস্তাবিত চুক্তিটি ‘চিরস্থায়ী’ হতে পারে এবং এতে খনিজ সম্পদের অধিকার ও পরিকল্পিত ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
ট্রাম্পের কল্পিত এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় স্থল, সমুদ্র ও মহাকাশজুড়ে ইন্টারসেপ্টর ও শনাক্তকারী প্রযুক্তি থাকবে, যার লক্ষ্য হবে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে সুরক্ষা দেওয়া।
গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থানের পাশাপাশি দ্বীপটির বিপুল ও এখনো অনেকটাই অনাবিষ্কৃত বিরল খনিজ সম্পদের মজুদের কথাও তুলে ধরছে ট্রাম্প প্রশাসন। এসব খনিজ আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে মোবাইল ফোন ও বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ।
নেটোর মহাসচিব মার্ক রুটে জানান, ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে গ্রিনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি আলোচনায় আসেনি। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ‘আজ রাতে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমার আলোচনায় বিষয়টি আর ওঠেনি।’
নেটোর মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট এক বিবৃতিতে বলেন, বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রসহ সব মিত্র দেশের জন্য আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তাগত গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার লক্ষ্য থাকবে—যেন অর্থনৈতিক বা সামরিকভাবে রাশিয়া ও চীন ওই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য পরিকল্পনার আওতায় গ্রিনল্যান্ডের একটি ছোট অংশ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে যেতে পারে, যেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা হবে। বর্তমানে ডেনমার্কের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র সেনা মোতায়েন করতে পারে। দ্বীপটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত পিটুফিক ঘাঁটিতে বর্তমানে একশর বেশি মার্কিন সেনা স্থায়ীভাবে অবস্থান করছেন।
এর আগে গ্রিনল্যান্ড কেনার বিষয়ে চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে নেটোর সঙ্গে আলোচনার পর বুধবার তিনি সেই হুমকি প্রত্যাহার করেন।
ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘এই বোঝাপড়ার ভিত্তিতে, পয়লা ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা থাকা শুল্ক আমি আরোপ করব না।’
দাভোসে দেওয়া বক্তব্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও বলেন, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিক আলোচনা চান, তবে শক্তি প্রয়োগ করবেন না। একই সঙ্গে তিনি ইউরোপীয় নেতাদের উদ্দেশে বলেন, ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রকে দিতে সম্মত হলে যুক্তরাষ্ট্র কৃতজ্ঞ থাকবে।
এর আগে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের হুমকির সমালোচনা করে বলেন, ‘নতুন শুল্কের অন্তহীন সংগ্রহ মৌলিকভাবেই অগ্রহণযোগ্য।’
এর জবাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ফ্রান্স কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ঠকিয়ে আসছে’। একই সঙ্গে তিনি কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন।
সূত্র: বিবিসি
মন্তব্য করুন